চাঁদে যেমন কলঙ্ক আছে,ফুটবল বিশ্বকাপেও রয়েছে রেফারি বিতর্ক। তবে চাঁদের কলঙ্ককে চাঁদের সৌন্দর্য হিসেবে কল্পনা করা হলেও রেফারি বিতর্ক কেবলি বিশ্বকাপকে করেছে কদাকার। তবে সমস্ত কদর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর জন্য ফিফা হাতে নিয়েছে VAR বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি। ফুটবল দুনিয়া এত প্রযুক্তির ব্যবহার আগে কখনও দেখেনি।

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি কি?

এতদিন পর্যন্ত একজন মূল রেফারি , দুইজন সহকারী রেফারি এবং একজন ম্যাচ অফিসিয়াল –সাধারণত এই চারজন মিলেই একটা ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করা হত। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে ভুলের মাত্রা আর বিতর্ক কমিয়ে আনার জন্য যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিরা। এটি আসলে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটা দল যারা ভিডিও রিপ্লে দেখে মাঠের রেফারির  সিদ্ধান্তকে পর্যবেক্ষণ করে এবং ভুল হলে সংশোধন করে দেয়। তিন সদস্য বিশিষ্ট এই দলে থাকবেন একজন প্রধান ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি  যাকে  অবশ্যই সাবেক কিংবা বর্তমান রেফারি হতে হবে, একজন সহকারী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি এবং একজন রিপ্লে অপারেটর। ভিডিও অপারেশান রুমে বসে বিভিন্ন এঙ্গেল এ বসান অনেক ক্যামেরার সহয়তায় তাঁরা পুরো ম্যাচকে অত্যন্ত নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফিফা ২০১৮ বিশ্বকাপে ১৩ জন VAR নিয়োগ দিয়েছেন, তবে প্রত্যেক ম্যাচে থাকবেন ৩ জন করে VAR।

VAR এর ইতিহাস

ফুটবলে প্রথম VAR ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৬ সালের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ম্যাচে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইংল্যান্ড এবং জার্মানির মধ্যকার এক প্রীতি ম্যাচে সর্বপ্রথম এর ব্যবহার হয়।

কোথায় কখন ব্যবহার হবে VAR?

  • গোল লিগ্যাল ভাবে হল কিনা তা পর্যবেক্ষণ করবে VAR এবং তা সাথে সাথেই মাঠে বসে পেয়ে যাবেন প্রধান রেফারি।
  • অহেতুক ডাইভিং, হ্যান্ডবল ও অবৈধ বাধা ডি বক্সে হলে তার ফলাফল ও বলে দিবে VAR। এসব ক্ষেত্রে মাঠে থাকা রেফারি VAR এর সাহায্য নিতে পারবে।
  • সঠিক প্লেয়ার কার্ড দেখানোর বেলাতেও VAR ব্যাবহার করা যায়।

২০১৮ এবং VAR

এবারের বিশ্বকাপে শুধুমাত্র গ্রুপ পর্বেই ৩৩৫ টা ঘটনাকেই VAR  দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তার মানে হল প্রতি ম্যাচে গড়ে সাতটি করে। ফিফার মতে VAR এর সাফল্যের হার ৯৯.৩%।

VAR এর সুবিধাসমুহ এবং VAR আবিষ্কারের আগে ফুটবল দুনিয়ার যত অঘটন

সত্যি কথা বলতে কি পৃথিবীর অন্যান্য সমৃদ্ধশালী ইতিহাসের মতই ফুটবল ইতিহাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বহু বিতর্ক। মজার ব্যাপার হল সেই অমীমাংসিত বিতর্ক চলছে  বছরের পর বছর ধরে। উদাহরণস্বরূপ হ্যান্ড অফ গড (৮৬ বিশ্বকাপ), মারাকানা ট্র্যাজেডি (৫০ বিশ্বকাপ),  ব্যাটেল অফ বার্ন(৫৪ বিশ্বকাপ), ফ্যানটম গোল (৬৬ বিশ্বকাপ), শেইম অফ গিজন (৮৬ বিশ্বকাপ) এর কথা না বললেই নয়। ২০০৬ বিশ্বকাপে ফাইনাল এ জিদানের বিতর্কিত লাল কার্ডের কথা কি আমরা আজও ভুলতে পেরেছি। এসব ঘটনা গুলির প্রায় সব গুলিই রেফারির সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কখনও রেফারি ভুল ফাউল দিয়েছেন বা মিস করেছেন, কখনও বা অফ সাইড দিতে ভুল হয়েছে। মাঠে রেফারি বলের আশেপাশে থাকেন। এত বড় মাঠের মধ্যে ঘটে যাওয়া যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাই সব সময় সম্ভব হয়না পুংখানপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা। এ সমস্ত সমস্যার সমাধানের জন্যই আসলে ভিএআর প্রযুক্তির আবির্ভাব হয়েছে। ভিএআর প্রযুক্তি দিয়ে এখন এসব দিকে নজরদারি করা হবে।

VAR এর সমালোচনা

ভিএআরকে পুরো ফুটবল দুনিয়া স্বাগত জানালেও কিন্তু এর বিরুদ্ধে সমালোচনা যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। VAR ব্যাবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বারবার খেলার মধ্যে বিরতি পরায় খেলার স্বাভাবিক ছন্দপতন হয়। আরও বড় একটা সমস্যা হল ভিএআর ব্যবহারের সময় দর্শকেরা সম্পূর্ণ ধোঁয়াশার মধ্যে থাকেন। রেফারির সাথে ভিএআরের কী কথা হচ্ছে, কোন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে সেটি কেন করা হলো, এসব বিষয়ে অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছেন দর্শকেরা। গোললাইন টেকনোলজির মত এটি কিন্তু সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর নয়। VAR এর সিদ্ধান্ত আসে মানুষের কাছ থেকে। পেনাল্টি কিংবা অফসাইডের মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে তাই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও থেকেই যায়।

 

কাভার ফটোঃ FIFA / Getty Images.