সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান সময়ে একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবরের কাগজ খুললেই চোখে পরে প্রতিদিন নানা সড়ক দুর্ঘটনার খবর। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল যেন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। নানা কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে এই সড়ক দুর্ঘটনা। এর মধ্যে চালকের বেপরোয়া গতি, আইন না মানার প্রবনতা, ট্রাফিক আইন না জানা ইত্যাদি অন্যতম।

বাংলাদেশের সড়ক দূর্ঘটনার গত কয়েক বছরের চিত্রঃ

গত সাড়ে চার বছরে (২০১৫-২০১৮ জুন পর্যন্ত) সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এ সকল হতাহত লোকের মধ্যে বেশির ভাগ লোকই  তরুণ এবং কর্মক্ষম ব্যক্তি, যাদেরকে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ধরা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ সকল তথ্য বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনষ্টিটিউটের (এআরআই)।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রয়েছে আইন, কিন্তু স্বভাবতই আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ খুব একটা দৃশ্যমান হয় না। দেশের সচেতন নাগরিক হতে শুরু করে যান চলাচলের সাথে সম্পৃক্ত লোক ও সাধারন পথচারীর অনেকেই ট্রাফিক আইন সমন্ধে উদাসীন। কিন্তু অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে আইন না জানার কারণে। তাই, চলুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের দেশের প্রচলিত কিছু ট্রাফিক আইন।

বাংলাদেশের ট্রাফিক আইনঃ

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মোটরযান আইন করা হয় ১৯৩৯ সালে।  এরপর সময়ের প্রয়োজনেই এই আইনের আরো একটি অধ্যাদেশ ১৯৮৩ সালে পাস করা হয়। ১৯৮৩ সালের ‘মোটরযান আইন’ অনুযায়ী কোন অপরাধে কি শাস্তির বিধান আছে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ

১) নিষিদ্ধ হর্ণ/হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহারঃ

ধারাঃ ১৩৯ – জরিমানা ১০০ টাকা 

সাধারণভাবে শব্দের মাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডেসিবল। তার চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি লোপ, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টিসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই এ ধরনের হর্ণ বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

২) আদেশ অমান্য, বাধা সৃষ্টি ও তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতিঃ

ধারাঃ ১৪০(১) – জরিমানা ৪০০ টাকা 

আদেশ অমান্য বলতে আমরা এখানে যে কোন ধরনের ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইন প্রয়োগে বাধা প্রদান করা বুঝায়।

৩) ওয়ানওয়ে সড়কে বিপরীত দিকে গাড়ি চালানোঃ

ধারাঃ ১৪০(২) – জরিমানা ২০০ টাকা

রাস্তার বিপরীত দিকে গাড়ি চালান অবশ্যই একটি জঘন্য অপরাধ, রাস্তায় যানজটের অন্যতম প্রধান একটি কারণ সড়কে বিপরীত দিকে গাড়ি চালানো।

৪) অতিরিক্ত গতি বা নির্ধারিত গতির চেয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোঃ 

ধারাঃ ১৪২ – জরিমানা ৩০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে জরিমানা ৫০০ টাকা

অতিরিক্ত গতির কারণে অনেক সময় রাস্তায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে, তাই চালকদের নির্ধারিত গতি সীমা মেনে চলা উচিৎ।

৫) দুর্ঘটনা সংক্রান্ত যে সকল অপরাধ থানায় ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাইঃ 

ধারাঃ ১৪৬ – জরিমানা ৫০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে জরিমানা ১০০০ টাকা 

এমন কোন অপরাধ যা সংঘটিত হয়েছে কিন্তু তা থানায় জানানো হয় নি। হতে পারে তা কোন সড়ক দুর্ঘটনা বা  ট্রাফিক আইনে দন্ডিত অপরাধ।  

৬) নিরাপত্তা বিহীন অবস্থায় গাড়ি চালানোঃ 

ধারাঃ ১৪৯ – জরিমানা ২৫০ থেকে ১০০০ টাকা

কিছু নিরাপত্তা জনক ব্যবস্থা না নিলে অনেক সময় যাত্রী এবং চালকের উভয়ের জীবনের ঝুকি থেকে থাকে। যেমন সিট বেল্টবাঁধা, হেলমেট পরা ইত্যাদি।

৭) কালো বা অতিরিক্ত ধোঁয়া বের হওয়া মোটরযান ব্যবহারঃ 

ধারাঃ ১৫০ – জরিমানা ২০০ টাকা 

গাড়ির কালো ধোয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক  ক্ষতিকর। এই কালো ধোয়ার ফলে হতে পারে এজমা, ক্যান্সার, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা।

৮) মোটরযান আইনের সাথে সঙ্গতিবিহীন অবস্থায় গাড়ি বিক্রয় বা ব্যবহার, গাড়ির পরিবর্তন সাধনঃ

ধারাঃ ১৫১ – জরিমানা ২০০০ টাকা

অনেক সময় এমন  হয় যে, কেউ অন্যের গাড়ি চুরি করে, গাড়ির রং পরিবর্তন করে, তা অবৈধভাবে বিক্রি করার চেষ্টা করে এবং বৈধ কাগজ পত্র ছাড়া গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলে তা আইনত দণ্ডনীয় হয়।

 

 

৯) রেজিষ্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা ফিটনেস সার্টিফিকেট অথবা রুট পারমিট ব্যতীত মোটরযান ব্যবহারঃ

ধারাঃ ১৫২ – জরিমানা ১৫০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলেঃ জরিমানা ২৫০০ 

সড়ক দূর্ঘটনার অন্যতম প্রধান একটি কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো। ঢাকা শহরে আমরা এই ধরনের যানবাহন অহরহই দেখে থাকি।

১০) অনুমোদন বিহীন এজেন্ট বা ক্যানভাসার নিয়োগঃ

ধারাঃ ১৫৩ – জরিমানা ৫০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে  জরিমানা ১০০০ টাকা

১১) অতিরিক্ত মাল বা অনুমোদিত ওজন অতিক্রম পূর্বক গাড়ি চালনাঃ

ধারাঃ ১৫৪ – জরিমানা ১০০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে জরিমানা ২০০০ টাকা  

অতিরিক্ত মালামাল গাড়িতে বহন করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে অনেক। এ সকল দুর্ঘটনা রোধ করতে দেশের ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তা মেনে চলতে হবে।   

১২) বীমা ব্যতীত গাড়ি চালানোঃ

ধারাঃ ১৫৫ –  জরিমানা ৭৫০ টাকা

প্রচলিত ট্রাফিক আইন অনুযায়ী গাড়ির বিমা থাকা বাধ্যতামূলক।

১৩) অনুমতি ব্যতীত গাড়ি চালানোঃ 

ধারাঃ ১৫৬ – জরিমানা ৭৫০ টাকা 

আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে তার একটি অনুমতির প্রয়োজন পরে  আমরা যাকে লাইসেন্স বলে থাকি। অনুমতি ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালালে সেটা অবশ্যই আইনত দণ্ডনীয়।

১৪) প্রকাশ্য সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিঃ 

ধারাঃ ১৫৭ –  জরিমানা ৫০০ টাকা 

ঢাকা শহরে রাস্তায় আপনি একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন যে, খুব কম চালক আছে যারা রাস্তার ট্র্যাক মেনে গাড়ি চালায়। কখনো ডানে কখনো বামে বা ওভারট্রেকিং এর জন্য রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি হয়ে রাস্তায় যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।

১৫) গাড়ির ব্রেক কিংবা কোন যন্ত্র অথবা গাড়ির বডি কিংবা স্পিড গভর্ণর সীল বা ট্যাক্সি মিটারের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করাঃ 

 ধারাঃ ১৫৮ – জরিমানা ৫০০ টাকা

অনুমতি ছাড়া অন্যের গাড়ির ব্রেক, ইঞ্জিন কাভার সহ অন্যান্য সেন্সেটিভ অংশে হস্তক্ষেপ করা আইনত দণ্ডনীয়।

 

১৬) যে সকল অপরাধের জন্য মোটরযান আইনে সুনির্দিষ্ট কোন শাস্তির ব্যবস্থা নেইঃ জরিমানা ২০০ টাকা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলেঃ জরিমানা ৪০০ টাকা (ধারাঃ ১৩৭)।

উপরের এই সকল অপরাধ মূলক কর্মকান্ড মেনে  চলা ছারাও আমাদেরকে রাস্তায় চলাচল করতে হলে কিছু অতি পরিচিত ট্রাফিক চিহ্ন বা নিয়ম মেনে চলতে হবে। 

ট্রাফিক চিহ্ন সমূহঃ  

আমরা রাস্তায় চলাচলের  সময় অনেক ধরনের লেখা দেখে থাকি যেমন ধীরে চলুন, ডানে মোড়, বামে মোড়, হর্ণ বাজানো নিষেধ, সামনে রাস্তা সুরু হয়ে এসেছে, সামনে রাস্তা উঁচু নিচু এই ধরনের  সিগনালগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে। 

একটি দেশের সড়ককে নিরাপদ রাখার জন্য অবশ্যই সাধারন জনগণের সাহায্য প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা পথচারী থাকে তাদেরকে অবশ্যই আইন মেনে চলতে হবে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

যে সকল ট্রাফিক আইন সকলের মেনে চলা উচিতঃ

  • রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে অবশ্যই ফুটপাত ব্যবহার করতে হবে।
  • রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিং অথবা ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে হবে।
  • রাস্তায় চলাচলের সময়  ফোনে কথা বলা উচিৎ নয় এতে দুর্ঘটনার সম্ভবনা থাকে।
  • সকল ট্রাফিক সাইন মেনে রাস্তায় চলাচল করতে হবে।
  • নির্ধারিত যাত্রী ছাওনি ছাড়া রাস্তার অন্য কোন স্থানে ভিড় করা ঠিকা না।
  • নিজে আইন মানা এবং অন্যকে আইন মানতে উৎসাহ দেওয়া।

আমরা আমাদের সড়ক গুলোকে যদি নিরাপদ করতে চাই তাহলে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতার। সড়ক দুর্ঘটনা যে হারে আমাদের দেশে বেড়ে চলছে তাতে করে রাস্তায় চলাচল করা যেন ভীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ট্রাফিক আইন  এবং সচেতনতা উভয়ই  আমাদের মাঝে বাড়াতে হবে।