রহিম সাহেব। পেশায় একজন সরকারি কর্মকর্তা। বিলাসিতা তাকে কখন ছুঁয়ে দেখেনি। তাকে মধ্যবিত্ত বললে ভুল হবে না। নীতি  আর আদর্শের জায়গায় তিনি পাহাড়ের মত অটল। চাকরী জীবনে নিজে কখন কারো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন নি এবং নিজেও অন্যায় কাজের ধার ধারেন নি।

খুব সাদাসিধে জীবন তার। বাসা থেকে অফিসের দরুত্ব কম ছিলো না, প্রায় ১০-১২ কিঃ মিঃ। যাতায়াতের জন্য কোন ব্যক্তিগত বা অফিসিয়াল গাড়ি ছিলনা। চাইলে তিনি আয়েসি জীবন যাপন করতে পারতেন। তিনি অফিস করেছেন লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে। কখনো তার পা মাড়িয়েছে  লোকে, কখনো ঘামের তীব্র গন্ধে তার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। মাঝে মাঝে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষায় অফিসের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। এর জন্য অফিসে রীতিমত বসের ঝাড়ি খাওয়া বাদ যায় নি।

মনে মনে ভাবতেন যদি নিজের একটা গাড়ি থাকতো, কতই না ভালো হত। কিন্তু সংসারের খরচ আর ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেই তাকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হত। এগুলো বাদ দিয়ে গাড়ি  ক্রয়ের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ যেন শধু মাত্র দিবাস্বপ্ন।

কিন্তু ইদানিং পরিস্থিতিটা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। রহিম সাহেবের আয় বেড়েছে, অফিসে সিনিয়রদের তালিকায় চলে গেছে সে। মনে মনে চিন্তা করেছে এবার একটা গাড়ি খারাপ হয় না। কিন্তু গাড়ির বিষয়ে তার তেমন কোন ধারণা নেই। কিভাবে গাড়ি পছন্দ করবে, কোন গাড়ি ভালো, কোনটার পারফরমেন্স ভালো, কোনটার কেমন দাম।

এমন অনেক রহিম সাহেবই আমাদের সমাজে আছে, যাদের একটা গাড়ি কেনার স্বপ্ন  তাড়া করে বেড়ায়। এই সকল রহিম সাহেবদের জন্য কিছু পরামর্শঃ

১ম ধাপঃ

আপনার প্রয়োজনিয়তা ঠিক করুনঃ  সবার আগে প্রয়োজন এবং পছন্দ ঠিক করুন। কি কাজে আপনি এটাকে ব্যবহার করতে চান। যেমন ফ্যামিলি সহ সকলে মিলে ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে বেশি ছিট সংখ্যা ও আকারে বড় ধরনের গাড়ি কিনতে হবে। এদের মধ্যে অন্যতম ( ভল্বো এক্স সি৯০, স্কোডা কোডিয়াক, অডি কিউ৭, কিয়া সরেন্টো ইত্যাদি)

এই গাড়ি গুলো আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন।  আবার যদি আপনি  সম্পূর্ণ পার্সোনাল ভাবে এটা ব্যবহার করতে চান তাহলে অল্প সিটের গাড়ি কেনাই ভালো যেমন, হুন্দাই আই২০, হোন্ডা জ্যাজ, মাজদা২ ইত্যাদি। আরও একটি বিষয় আপনি খেয়াল রাখতে পারেন সেটি হলো, গাড়ির বাঙ্কারে বা ট্রাঙ্কে কোন ধরনের মালামাল বহন করতে চান কিনা সেই দিকে খেয়াল রাখতে পারেন।

নির্ধারণ করুন আপনি কি ধরনের গাড়ি কিনবেনঃ আপনি কেমন গাড়ি কিনবেন, নতুন নাকি পুরাতন এ বিষয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে ঝামেলা অনেকটা কম, কিন্তু আপনি যদি সেকেন্ড হ্যান্ড কোন গাড়ি কেনার কথা চিন্তা করেন তাহলে আপনাকে অনেক বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি, পূর্বের মালিক কতদিন ব্যবহার করেছে,গাড়ির মাইলেজ কত ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয়ে খেয়াল করতে হবে। এ জন্যে আপনাকে একটু সময় নিয়ে বিষয় গুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে।  

বাস্তবসম্মত বাজেট নির্ধারণ করুনঃ বাজেট অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকেই বলে আপনার বাজেটের উপর ডিপেন্ড করে আপনাকে গাড়ি দেখতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় পছন্দ এবং প্রয়োজনিয়তার উপর বাজেট ঠিক করা উচিত। বাজারে আপনি অনেক ব্র্যান্ডের ভিন্ন ভিন্ন দামের গাড়ি পাবেন। যেমন টয়োটা ব্র্যান্ডের গাড়ি আপনি যে বাজেটের মধ্যে কিনতে পারবেন প্রোটন, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, সুবারু ব্র্যান্ডের গাড়ি কিন্তু সেই বাজেটে কিনতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে আপনার পছন্দ বা প্রয়োজনিয়তার প্রাধান্য আগে। বর্তমান সময়ে গাড়ির দাম,মডেল বা বিস্তারিত তথ্য জানা কিন্তু খুব কঠিন একটা বিষয় না, বাংলাদেশে গাড়ি বিক্রয়কারী যে কোন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে একটু ঢু মারলেই জানতে পারবেন কোন গাড়ির কেমন দাম। সেখান থেকে একটা আইডিয়া নিয়ে আপনি একটা যৌক্তিক বাজেট ঠিক করতে পারবেন। 

বাজার ঘুরে দেখুন এবং দামের তুলনা করুনঃ আপনি নিশ্চই আপনার নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই সেরা গাড়িটি ক্রয়ের আশা করেন। সকল  ক্রেতাই কিন্তু এমনটাই আশা করেন, এ জন্য প্রয়োজন কিছু গবেষণা। তাই নিজের মনের মত একটা গাড়ি ক্রয় করতে হলে আপনাকে বাজার যাচাই করতে হবে। কোন গাড়ির কত দাম কোন গাড়ির পারফরমেন্স ভাল সে সমন্ধে একটা স্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। আপনি কতগুলো মার্কেট প্লেস ভিজিট করলে দামের ভালো একটি ধারণা পাবেন।

২য় ধাপঃ

গাড়ির বাহ্যিক যে সকল বিষয়গুলো আপনাকে জানতে হবেঃ আপনি যদি ভালো একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি ক্রয় করতে চান তাহলে গাড়িটি বাহ্যিক ভাবে কোন অবস্থায় আছে সেই বিষয়টি কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যাচাই করতে হবে। এর জন্য আপনাকে যে যে কাজগুলো করতে হবেঃ

পর্যাপ্ত আলোর নিচে থাকা অবস্থায় গাড়িটি পর্যবেক্ষণ করুনঃ মোটামুটি গাড়িটি বাহ্যিকভাবে আপনার পছন্দ হয়েছে, এবার আপনি গাড়ির খুটিনাটি বিষয়গুলো দেখবেন। যেমন গাড়িটিতে ফলস রঙ করা কিনা, কোথাও কোন ঘষা-মাজা আছে কিনা। এই কাজ গুলো আপনি যখন করবেন তখন আপনি অবশ্যই পর্যাপ্ত আলো আছে এমন জায়গা বেছে নিবেন। কারণ পর্যাপ্ত আলো ছাড়া আপনি এই সমস্যা গুলো বুঝতে পারবেন না।

একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ড্রাইভ করে নিনঃ  গাড়িটি যেহুতু আপনি ব্যবহার করবেন সেহুতু অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজেই একটা টেষ্ট ড্রাইভ দিন। এতে করে গাড়িটি সম্পর্কে আপনি অনেক কিছু ক্লিয়ার হতে পারবেন। যেমন গাড়িটি আপনার জন্য আরামদায়ক হবে কিনা, গাড়িটির মাইলেজ কেমন বা যদি কোন ত্রুটি থাকে তাহলে আপনি ধরতে পারনবেন।  

গাড়ি পরীক্ষা করানোর জন্য একজন মেকানিকের সহায়তা নিনঃ গাড়ির যন্ত্রাংশ সম্পর্কে ভালো ধারণা আপনার নাও থাকতে পারে সেক্ষেত্রে আপনি একজন বিশ্বস্ত মেকানিকের সহায়তা নিন। একজন ভালো মেকানিক খুব সহজে নিখুঁত ভাবে আপনার গাড়ির ইঞ্জিন সম্পর্কে ধারণা দিতে পারবে। আপনি যে গাড়িটি পছন্দ করেছেন সেই গাড়ির ইঞ্জিনের কোন বড় ধরনের সমস্যা আছে কিনা, বা গাড়িটি যদি আপনি ফাইনালি ক্রয় করেন তাহলে আপনি কেমন পারফরমেন্স পবেন সেই সম্পর্কে একটি বাস্তব ধারণা নিয়ে নিন।

গাড়ির ফুয়েল খরচ এবং রক্ষনাবেক্ষন খরচ দেখে নিনঃ গাড়ির ফুয়েল খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি যে গাড়িটি ক্রয় করবেন তার ফুয়েল খরচ সমন্ধে জেনে নিন। এখানে আমি কিছু ফুয়েল ইফিসিয়েন্ট গাড়ির নাম উল্লেখ করছি Yaris Liftback, Yaris, Corolla, Corolla Hybrid,Priu, Camry, Camry Hybrid এই গাড়ি গুলো আপনার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন।

গাড়ির বৈধ কাগজ যাছাই করুনঃ গাড়ি ক্রয়ের পূর্বে আপনাকে অবশ্যই গাড়ির বৈধ কাগজ যাছাই করে নিতে হবে। গাড়ির কাগজপত্র ঠিক না থাকলে আপনাকে পরে ঝামেলায় পড়তে হবে।

ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি সমন্ধে জানুনঃ আপনি যদি সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি কিনেন সে ক্ষেত্রে কোন ধরনের ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি পাবেন কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হোন। যদি কোন ধরনের ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি দিয়ে থাকে তাহলে এ বিষয়ে চুক্তিপত্র করে নিতে পারেন। তাহলে আপনি ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টির বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারবেন।  

ডিল সম্পন্ন করুনঃ সবকিছু ঠিক ঠাক হয়ে আপনি ডিল সম্পন্ন করুন। পেমেন্টের বিষয়ে খোলা মেলা আলোচনা করুন। পেমেন্ট কিভাবে করবেন ক্যাশ দিবেন নাকি কিস্তিতে পেমেন্টা করবেন সেইটা ফিক্সড করুন। কোন ভাবে পেমেন্টে গেলে আপনি লাভবান হবেন সেইটা ক্যাল্কুলেশন করেন।  

একটি গাড়ি আবশ্যিক প্রয়োজনের তাগিদে মোটেও কোন বিলাসিতা নয়। বরং আমি বলব যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আপনি এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। নিজ প্রয়োজনে হোক কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে হোক আপনি যখন একটা গাড়ি ক্রয় করবেন তখন অবশ্যই উপরের বিষয়গুলো আপনাকে মাথায় রাখতে হবে।