আজ থেকে সাতশ বছর আগের ঘটনা। তখনকার  জার্মানি আজকের মতো আধুনিক ছিল না। এলোমেলো ছিল জার্মানির ছোট্ট শহর হ্যামিলিন। গোটা শহরের মানুষ ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ইঁদুর থেকে বাঁচার কেউ কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। হঠাৎ শহরে এসে হাজির হলো রহস্যময় এক বাঁশিওয়ালা। তার বাঁশির সুরে মোহিত করে সব ইঁদুরকে তিনি ওয়েজার নদীতে ফেলে দিলেন। শহরে ফিরে এসে তিনি যখন পূর্বের ওয়াদাকৃত পারিশ্রমিক চাইলেন, মুখ ফিরিয়ে নিল শহরের মেয়র ও গণ্যমান্য মানুষরা। প্রতিশোধ নিতে কিছুদিন পর আবার ফিরে এল সেই বাঁশিওয়ালা। এবার তাঁর বাঁশির জাদুকরী সুর দিয়ে শহরের ছোট ছোট শিশুদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসলো। তাদের সঙ্গে নিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল সেই বাঁশিওয়ালা।

আপনার কাছে কি মনে হয় হ্যামিলনের ঐ বাঁশিওয়ালা আসলেই হারিয়ে গেছে? না, সে ফিরে আসছে বার বার হাজার নামে, হাজার ঢঙে। তাঁর ঐ বাঁশির ফাঁদে আজও আমরা পা বাড়াচ্ছি নিজের অজান্তে। সুপারবাগ বর্তমান কালের এমনই এক ফাঁদের নাম।

সুপারবাগ কীঃ 

সুপারবাগ হচ্ছে এমন এক ব্যাক্টেরিয়া যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করে না।

আজ থেকে ১০ বছর পরের কথা চিন্তা করুন। গ্রীষ্মের এক সকালে চাকু দিয়ে আম কাটতে গিয়ে আপনার হাতটা সামান্য কেটে গেল। সামান্য মানে সামান্য। খুব বেশি পাত্তা দেবার মত কিছু না। তাও সাবধানতা বসত একটু এন্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে নিশ্চিন্ত থাকলেন আপনি। কিন্তু দুইদিন না যেতেই ক্ষত জায়গাটা ফুলে পুঁজ বের হতে শুরু করল। কিছুটা ভীত হয়ে আপনি গেলেন ডাক্তারের কাছে। এবার আপনাকে কিছু প্রসেস এর মধ্য দিয়ে যেতে হল- প্রথমে এন্টিবায়োটিক খাওয়া, তাতেও না কমায় প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা।

পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ডাক্তারের মুখ কালো হয়ে গেল, ডাক্তারের কালো মুখ দেখে আপনার মুখ আরও বেশি কালো হয়ে গেল। নীরবতা ভেঙ্গে ডাক্তার বললেন আপনার ইনফেকশন যে জীবাণু দিয়ে হয়েছে, সেটা প্রচলিত সব এন্টিবায়োটিকেই রেসিস্ট্যান্ট করে , অর্থাৎ, কোন এন্টিবায়োটিকই এই জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী নয়। তাহলে উপায়? কোন উপায় নাই, ব্যকটেরিয়া ততক্ষনে রক্তের মাধ্যমে আপনার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে, বাসা বাঁধছে বিভিন্ন অঙ্গে। এখন অপেক্ষা মৃত্যুর।

শুরুর দিকের কথাঃ

অ্যান্টিবায়োটিক-পূর্ব যুগে সংক্রামক ব্যাধি ছিল মারণব্যাধি। ইতিহাসের পাতায় খুঁজলেই পাওয়া যাবে সংক্রামক ব্যাধির মহামারীর গল্প– যা ধ্বংস করেছে একের পর এক শহর, জনপদ আর সভ্যতা। প্লেগ, সিফিলিস, কলেরা, ম্যালেরিয়া আর যক্ষ্মার মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে কোটি মানুষের জীবন; ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কার করেন প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দেওয়া এই ওষুধকে ডাকা হত ‘মিরাকাল ড্রাগ’। চিকিৎসাশাস্ত্রে পৃথিবীজুড়ে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে পেনিসিলিন।

সেই সময়ে মানুষ ভেবেছিল এই একটা মাত্র ড্রাগ দিয়ে সংক্রামক ব্যাধি পুরো পৃথিবী থেকে মুছে দেয়া সম্ভব। মানুষের এই ভাবনা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাঁচকলা দেখে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের ১০ বছরেরও কম সময়ে, এমনকি স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য পাওয়া নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আগেই এক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া হয়ে ওঠে পেনিসিলিন-প্রতিরোধী।

ব্যাক্টেরিয়া এত সাহস কি করে পেলঃ

অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকা অথবা প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করা ব্যাকটেরিয়ার একটি সহজাত প্রক্রিয়া। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যাকটেরিয়া হয় নিজেদের কোনোভাবে পাল্টে ফেলে, অথবা এমন সব রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিককে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়। এর ফলে যেসব ব্যাকটেরিয়া আগে ক্ষতিকর ছিল না তারা এখন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বর্তমানে ব্যবহৃত সব প্রজাতির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই কোথাও-না-কোথাও, কোনো-না-কোনো প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধের খবর জানা গেছে। আবার একই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া ক্রমাগত একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করার মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে বহু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ভয়ানক সুপারবাগে– যাদের বিরুদ্ধে আমাদের হাতে তেমন কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট নেই।

আমরা না জেনে, না বুঝে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছি, এমনকি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। ডাক্তাররাও প্রায়শই যথাযথ ল্যাব টেস্ট না করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনে লিখে দিচ্ছেন অবলীলায়। ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে রোগের প্রকৃত কারণ বের না করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন দিলে তাতে চিকিৎসায় ভুল হওয়ার অনেক বেশি আশঙ্কা থাকে। আর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

আরেকটি ভয়াবহ  ব্যাপার হল, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ না করা। গবেষণায় দেখা গেছে, অল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে সহযোগিতা করে এবং পরবর্তীতে বেশি মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেও তাতে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে। কাজেই অ্যান্টিবায়োটিকের সুপারিশকৃত ডোজ সম্পূর্ণ করা উচিত যাতে ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে না পারে।

যদিও এটা অবধারিত যে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে এর বিরুদ্ধে একসময় না একসময় প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হবেই। কিন্তু আমাদের অসচেতনতা, স্বভাব এবং অবহেলার কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার গুণ দ্রুতগতিতে।

ভয়াবহতাঃ

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে এখনই সাবধান না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে প্রতি বছর এক কোটির বেশি লোক মারা যাবে এবং ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বছরে দুই লক্ষাধিক, যার মধ্যে ২৩ হাজার লোকের মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়ে সাত লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করে একই কারণে।

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। সীমিত গবেষণাপত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে যার মধ্যে বহু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগ রয়েছে। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির আইসিইউতেই শতকরা ২৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া হল সুপারবাগ, যা কিনা সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী। এসব তথ্য নিঃসন্দেহে প্রকৃত চিত্রের খুব সামান্য প্রকাশ, কিন্তু আতংকিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া কি আমরা চলতে পারবঃ অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন জীবন কেমন হতে পারে একটু ভেবে দেখুন তো? অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে সামান্য কাটাছেঁড়া থেকে জন্ম নিতে পারে জীবননাশী ইনফেকশন। সন্তান প্রসবের সময় মা ও নবজাতক দুজনেরই ইনফেকশনের আশঙ্কা থাকে খুব বেশি, যা হতে পারে নবজাতকের মৃত্যু অথবা চিরস্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার কারণ। আর সার্জারির কী হবে? সার্জারির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক অপরিহার্য। কেননা কাটাছেঁড়া আর ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি, যা কিনা রক্তে ছড়িয়ে রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে শুধুই সংক্রামক রোগ নয়, অন্যান্য অনেক রোগ যেমন ক্যানসার, আর্থ্রাইটিস এবং কিডনি রোগের চিকিৎসাও সম্ভব নয়। কেননা এসব ক্ষেত্রে রোগীকে এমন সব ওষুধ দিতে হয় যা আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে ফেলে, যাতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। মোদ্দা কথা, ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণ থেকে মৃত্যুঝুঁকির আতংক হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী।

বাঁচতে হলে শুধু জানলেই হবে না, মানতেও হবেঃ

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিকভাবে। সত্যি বলতে কী, কোনো এক দেশ এককভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কেননা উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সারা বিশ্বের মানুষ এখন একই সূত্রে বাঁধা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই নিশ্ছিদ্র হোক না কেন, সাদা চোখে অদৃশ্য, এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সুপারবাগের প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। এর প্রমাণ হল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখান থেকে কোনো না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। সুপারবাগ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে এখনই তাই যুদ্ধ ঘোষণার সর্বশেষ সময়।

এ যুদ্ধ কোনো সুনির্দিষ্ট পেশাজীবীদের নয়। এ যুদ্ধে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, গণমাধ্যম, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, বিজ্ঞানী এবং ডায়াগনস্টিক ল্যাবসহ সবারই কিছু না কিছু করার আছে। আশার কথা হল, সম্প্রতি জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে লড়তে একমত হয়েছে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর সাফল্যের মুখ দেখতে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন এর যথাযথ প্রয়োগের।

 

সুপারবাগ বনাম মানুষ– এ লড়াইয়ে মানুষ জিততে পারবে কি?

মানুষ পেরেছে পৃথিবী থেকে গুঁটিবসন্ত সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে– পেরেছে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে মহামারী ঘটানো রোগবালাই, যেমন প্লেগ, কুষ্ঠ ও ডিপথেরিয়া। পারতে হবে সুপারবাগের বিরুদ্ধেও। তা না হলে এই দালানকোঠা, গাড়িঘোড়া, স্যাটেলাইট, স্মার্টফোন, ফেসবুক, টুইটার সবই অর্থহীন হয়ে যাবে।