বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে হাজারো সম্ভবনা যেমন হাতছানি দেয়, তেমন  কিছু সমস্যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়ায়। বর্তমান সময়ে যানজট তেমন এক উদ্বেগের কারণ, যার ফলে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অব্যাহত চেষ্টা যতটা আছে, ততটা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট। এ যেন অদৃশ্য কোন শক্তির মত দেশের অর্থনীতিকে টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। ম্যানুয়াল কোন পদ্ধতি যখন কোন ভাবেই কাজ করছে না তখন বিশেষজ্ঞ মহলের চিন্তা কৃত্রিম বুদ্ধি মত্তার দিকেই। 

যানজটের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণঃ 

যদিও যানজটের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সংখ্যার মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য, কিন্তু সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি আসলে কতটা ভয়াবহ তা একটু গভীরভাবে পার্যালোচনা করলে অনুমেয় হবে। 

প্রথম আলোর এক তথ্যমতে যানজটের ফলে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকার সমান। এই ক্ষতির পরিমাণ তো দৃশ্যমান কিন্তু মানুষের শারীরিক, মানসিক, এবং স্বাস্থ্যগত যে সমস্যা হচ্ছে এর প্রভাব কিন্তু দীর্ঘস্থায়ি।

                                                                                     Image source: Prothom Alo

বর্তমান পদ্ধতিতে যানজট না কমার কারণঃ

যানজট প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে, কোন ভাবেই এর লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা শহরের বর্তমান গাড়ির গতি ঘন্টায় ৫ কিমি, যা মানুষের পায়ে হাটা গতির চেয়ে কম। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে হাজারও কর্ম ঘণ্টা। 

যানজট কমাতে যে কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না তা কিন্তু না, কিন্তু যানজটের এই স্থবিরতাকে কোন ভাবেই কমানো যাচ্ছে না। ম্যানুয়াল কোন পদ্ধতি যখন কোন কাজ করেনা তখন অন্য ভাবনা ভাবতে দোষ কোথায়। 

যানজট না কমার অনেক কারণই আপনি খুঁজে পাবেন, কখনো মনে হবে রাস্তার দুই পাশে অবৈধ পার্কিং যানজটের কারণ, কখনো মনে হবে রাস্তায় তুলনামূলক প্রাইভেট কার যানজটের প্রধান কারণ। এছারও ফুটপাথ দখল, ট্রাফিক আইন না মানা বা ট্রাফিক আইন না জানা এই প্রতিটা বিষয়কে যানজটের কারণ হিসেবে আপনি দায়ী করতে পারেন। 

এবার সমাধানের বিষয়ে আসা যাক। সাধারন ভাবে চিন্তা করলে সমাধানের চিন্তাগুলো যে ভাবে আসবেঃ

১) অবৈধ পার্কিং তুলে দিয়ে বৈধ পার্কিং এর ব্যবস্থা করা

২) অনেকে বলবেন গণপরিবহনের পরিমান বৃদ্ধি করে প্রাইভেট কার কমিয়ে নিয়ে আসা।

৩) সাধারন জনগণকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে আগ্রহী করে তুলা।

৪)  প্রয়োজনমত রাস্তা সম্প্রসারণ করা। 

এই যে সকল সমাধানের কথা আমরা বলছি, এর চেয়ে বেশি যদি আমরা পাই তবে কেমন হয়?  হ্যাঁ, এই সকল সমাধানসহ আরো বেশি কিছু দিতে প্রস্তুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিঃ

এটি অবশ্যই কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা। কিছু শক্তিশালী কম্পিউটারের সাথে যখন প্রয়োজনীয় কিছু পোগ্রাম জুড়ে দেওয়া হয় এবং তা যুক্ত থাকে বাহিরে লাগানো কিছু সেন্সরের সাথে যা প্রয়োজনীয় স্থানের উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।  প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে যাকে সংক্ষেপে বলা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা (AI)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে কাজ করবেঃ

পৃথিবীর প্রায় বেশিরভাগ দেশে এখনো ম্যানুয়ালি ট্রাফিক লাইটের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থা আরো নিচের ধাপে, যা হাতের ইশারায় ট্রফিক পুলিশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। 

এই ধরনের ম্যানুয়াল কোন ব্যবস্থাতেই কোন শহরের যানবাহনের নির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। কোন রাস্তা ফাঁকা আছে কোন রাস্তা বেশি ব্যস্ত এর নির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। 

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যস্ত শহরের সকল রাস্তার বর্তমান চিত্র থাকবে, কোন রাস্তা ব্যস্ত কোন রাস্তা ফ্রি তার সঠিক চিত্র থাকবে। কখন কোন রাস্তায় গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া হবে কোন রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে স্বয়ংক্রিয় ভাবে।

কতগুলো নির্দিষ্ট ধাপে কাজ করবে এই সিস্টেমঃ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কাজ করতে হলে শহরের পুরো সিস্টেমকে ঢেলে সাঁজাতে হবে। যেমন শহরের পুরো রাস্তা সেন্সর/ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। কিছু দক্ষ্য আই টি বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হবে এবং রক্ষনাবেক্ষনের জন্য প্রয়োজন হবে কিছু দক্ষ্য জনবলের। 

যে সকল ধাপে কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

তথ্য সংগ্রহঃ 

রস্তায় বসানো সেন্সর ক্যামেরার মাধ্যমে সকল গাড়ির তথ্য একটি সার্ভার সেন্টারে নিয়ে নেওয়া হবে এবং বলা বাহুল্য যে এখান থেকেই সকল ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োগ করা হবে। এই তথ্যের মধ্যে থাকবে গাড়ির ধরণ, মালিক, গাড়ির অবস্থান সহ প্রয়োজনীয় সকল তথ্য। শুধু গাড়ির তথ্য না ফুটপাতের পথচারীর তথ্যও নিয়ে নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে এই কাজ করার জন্য স্যাটেলাইটের সাহায্য নেওয়া হতে পারে।

তথ্য বিশ্লেষণঃ 

মূল কাজটিই হবে এখানে, পুরো শহরের সংগ্রহকৃত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। শহরের কোন রাস্তায় কি সংখ্যক গাড়ি আছে, কি ধরনের গাড়ি আছে, রাস্তায় জ্যামের পরিমাণ কেমন আছে তা নির্ণয় করা হবে। এবং যে রাস্তায় জ্যাম আছে তার বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করা হবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে। 

সিদ্ধান্ত গ্রহণঃ 

প্রাপ্ত তথ্য থেকে শহরের সকল চিত্র যখন হাতে পাওয়া যাবে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক দিকে গাড়ির গতিপথ বদলে দেওয়া হবে। ফার্মগেট থেকে মতিঝিল যাওয়ার একাধিক রাস্তা আছে, কিন্তু এর সমন্বয় করা কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটি সহজ করে দিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ধরুন, যদি এমন হয় ফার্মগেট থেকে মৎসভবন এলাকা দিয়ে মতিঝিল আসার রাস্তায় ট্রাফিক অনেক বেশি, তাহলে এই সিস্টেম এই রাস্তায় গাড়ি চলাচল কমিয়ে দিয়ে মগবাজার এলাকা দিয়ে গাড়ি চলাচল বাড়িয়ে দিবে। এভাবে গাড়ি চলাচলের মধ্যে একটি সমন্বয় করে যানজট কমিয়ে নিয়ে আসবে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফলতাঃ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যানজট নিরসনের প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভাবনীয় সাফল্যও পাওয়া গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত পিটসবার্গ শহরের একটি অংশে ২০১২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের উপর। গবেষকরা সফলভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন। তারা নিজেদের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তিটির নাম দেন ‘সারট্র‍্যাক’ (Surtrac)।

তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক জোনে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে গন্তব্যে পৌঁছাতে ২৫% কম সময় লাগছে, ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহনের আটকে থাকার হার ৪০% কমে এসেছে, যানগুলোকে আগের মতো ঘন ঘন সিগন্যালে পড়তে হচ্ছে না এবং সেই সাথে যানবাহন থেকে নির্গত ক্ষতিকর ধোয়ার পরিমাণ ২০% কমেছে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যতঃ

চালকবিহীন গাড়ি এখন আশ্চর্য হবার মতো কিছু না, ভবিষ্যতে চালকবিহীন গাড়ি চলাচলের পরিমাণ বেড়ে যাবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। মূলত সেই সময়টাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ ভাবে কাজ করবে। কারণ মানুষ কথা না শুনলেও মেশিন অবশ্যই কথা শুনবে। 

অন্যান্য যে সকল সুবিধা পাওয়া যাবেঃ 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যখন সকল গাড়ির ডাটা কোন কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টারে থাকবে তখন এই একই ডাটা ব্যবহার করে অনেক ধরনের কাজ করা সম্ভব। 

১) অপরাধ প্রবণতা অনেকটা কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

২) মুহূর্তের মধ্যে কোন গাড়ির অবস্থান কোথায়, কোন গাড়ি ট্রাফিক আইন অমান্য করেছে তা বোঝা যাবে।

৩) গাড়ি চুরি অনেকটা রোধ করা যাবে। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীঃ

একটি শহরের সকল যানবাহনের তথ্য যেহতু একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে যুক্ত থাকবে যার ফলে কোন হ্যাকার যদি এই ডাটা কোন ভাবে চুরি করতে পারে বা নিজের নিয়িন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে তাহলে বড় ধরনের কোন অপরাধ সংগঠিত করতে পারবে। যা বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। 

যখন ব্যক্তিগত কোন গাড়ি ট্র্যাকিং এর আওতায় নিয়ে আসা হবে তখন অনেকে এ বিষয়ে আপত্তি তুলতে পারে যা পুরো ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারে। 

অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছের বিপরীত কিছু ঘটতে পারে। 

তবে সার্বজনিন কোন ভালোর জন্য কিছু সমস্যা আমরা মেনে নিতেই পারি। একটি কর্মব্যস্ত অথচ যানজটমুক্ত একটি শহর দেখার অপেক্ষায় আমরা সকলে। যানজটের এই স্থবিরতাকে দূর করে একটি চলমান নির্মল শহরের দাবী নিয়ে অপেক্ষায় থাকব প্রযুক্তির বাস্তবায়নের দিকে।