“এখন কাউয়ার চেয়ে ক্যামেরাম্যান বেশি। ডিএসএলআর ক্যামেরা থাকলেই ফটোগ্রাফার হওন যায় না রে পাগল।”  কথা গুলি একটু দৃষ্টি কটু শোনা গেলেও ফটোগ্রাফি দুনিয়াতে হাল সময়ে এ কথা বেশ চলছে। একজন ফটোগ্রাফার হতে হলে সাধনা করতে হয়, লেগে থাকতে হয়। ফটোগ্রাফির এনালেটিক্যাল কিংবা থিওরেটিক্যাল ব্যাপারগুলো খুব একটা না বুঝলেও এটা বোঝা কঠিন নয় যে, একটি ফটোগ্রাফ দর্শকের মগজে একটা গল্প তৈরি করে দেয় । একটা সময়ের গল্প, একটা মুহূর্তের গল্প, কখনও একটা জীবনের গল্প । তাই চলুন কেবলই স্রোতে গা না ভাসিয়ে কিছু কিছু জিনিস মাথায় রেখে ক্যামেরা হাতে ধরি। আর গল্পকে তুলে আনি জীবন্ত আবহে।

ভালো ফটোগ্রাফার মানেই ভালো ক্যামেরা নয়ঃ

কার লেন্স কোন সিরিজের, কার ক্যামেরায় বিরাট ব্যাটারি গ্রীপ, কার ক্যামেরার বডি কি এসব ব্যাপারগুলিতে অনেক কিছুই যায় আসে যখন ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারের পিছনের চোখটা ভালো না হয়, আর চোখের পিছনের মগজটা যদি সৃষ্টিশীল না হয়। তবে একথা হেসে উড়িয়ে দেবার অবকাশ নেই যে ভালো গিয়ার একজন ফটোগ্রাফারের ক্ষমতা বাড়ায় , কিন্তু লিওনার্দো দা ভিঞ্জি কোন কালি দিয়ে ছবি এঁকেছিলেন তার খবর কে নেয় বলুন?

ভালো ছবি মানেই ফটোশপ নয়ঃ

চমৎকার একটা চোখ ধাঁধানো ছবি দেখলেই ভাববেন না এটা নিছকই ফটোশপের কেরামতি। একজন ভালো ফটোগ্রাফার সব সময় চায় “ইন ক্যামেরা” ছবি তুলতে। ডিজিটাল যুগ আসার অনেক আগে থেকেই ফটোগ্রাফি ট্রিক ব্যবহার হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। এখন তো এক্সপেরিমেন্ট করা আরও সহজ কারণ এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল জানতে এখন আর আপনাকে ডার্ক রুমে যাওয়া লাগে না। বরং খুব সহজেই দেখা যাচ্ছে।

শ্যালো ডেপথ অফ ফিল্ড এর অপব্যবহারঃ

ছবির ফোকাস করা অংশ বাদে বাকি সব ঘোলাটে করে দেয়া অনেক দৃষ্টিনন্দন। তবে অনেকে মনের আনন্দে এটার মিস- ইউজ করা শুরু করে দেন। লেন্সের সর্বোচ্চ এপ্যাচার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না । এতে মনে হয় ডিএসএলআর এর মজা বুঝি শেষ। তবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে কোন ছবিতে কতটা এপ্যাচার রাখবেন তা জানার জন্য নীলক্ষেতের গাইড বইয়ের দরকার পরবে না । Flickr ব্রাউস করুন, বাঘা বাঘা ফটোগ্রাফারদের কাজ কারবার দেখুন। নিজেই বুঝতে পারবেন।

গ্রামারের বাইরে যেতে অনীহাঃ

কিতাবে লেখা আছে বলে অন্ধের মত অনুসরণ  করা যদি আপনার চর্চা হয় তবে আপনি খুব বেশি ভালো করতে পারবেন না। গ্রামার অবশ্যই জানতে হবে এবং মানতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনে সেই গ্রামার থেকে বের হবার মানসিকতা না থাকলে জীবনে অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলবেন।

জেনে রাখুন কিছু ফটোগ্রাফিক সাইটের নামঃ

Lens Culture,Digilab,Adobe Photoshop Express,Picasa,Photo Visi,Flickr,Photobox ইত্যাদি হতে পারে আপনার জন্য খুব কাজের কিছু ফটোগ্রাফিক সাইট।

সাদা কালো এবং মনোগ্রামঃ

মনে আছে ছোট বেলায় পড়া সেই জ্ঞানগর্ভ কথাঃ সব রাসুলই নবী কিন্তু সব নবী রাসুল নয়। তেমনি ভাবে সব সাদাকালোই মনোগ্রাম কিন্তু সব মনোগ্রাম সাদাকালো নয়। একটি রঙের বিভিন্ন শেড দিয়ে ফুটিয়ে তোলা ছবিকে বলা হয় মনোগ্রাম। মনোগ্রাম ছবি সাধারণ ছবি থেকে একটু বেশি মাত্রায় নাটকীয় হয়। উঠতি ফটোগ্রাফাররা এই দিয়ে হাবিজাবি ছবি পার করে দেবার নিছক চেষ্টা চালায়। তাই কখন সাদাকালো ছবি তুলবেন আর কখন তুলবেন না সেই সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আপনাকে একটু মাথা খাটাতেই হবে।

লাকি সেভেনঃ

  1. ট্রাইপড নেই? ল্যাম্পশেড ব্যবহার করুন।
  2. Hotshoe PEZ Dispenser দিয়ে বাচ্চাদের আকৃষ্ট করুন।
  3. এক ফ্ল্যাশেই দিন থেকে রাত পার করা যায়।
  4. লেন্স খুলে ম্যাক্রোর সুবিধা নিন।
  5. ট্র্যাভেল ফটো থেকে বাইরের মানুষকে সরিয়ে দিন।
  6. শেইপড বোকেহঃআপনি চাইলেই এই Bokeh এর শেইপ পরিবর্তন করতে পারেন। এ জন্য একটি কালো কাগজকে আপনার লেন্সের ফ্রন্ট ইলিমেন্টের সাইজ অনুযায়ী কাটুন। এরপর একটি ব্লেড দিয়ে পেপারের মাঝে একটি শেইপ কাটুন। তবে এই শেইপটি অবশ্যই থাম্বনেইলের চেয়ে সামান্য বড় হতে হবে।
  7. প্রখর উজ্জ্বল আকাশ ঢাকুন GND filter দিয়ে।

মনে রাখতে হবে আরও কিছু নিয়মঃ

ছবি তোলার সময় শুধুমাত্র ক্যামেরার পেছনে থাকলেই চলবে না। যার ছবি তোলা হচ্ছে তার সাথে কথা বলে ছবির মূল ভাবনাটা তার ভেতর ফুটিয়ে তুলতে হবে। শাটার স্পিড ব্যবহার করে ফ্লাস এক্সপোজ করা যাবে না। গিয়ারের উপর বেশি ফোকাস করা,ক্যামেরার সেটিংয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়া, অতি দ্রুত কাজ করা, ভুল হওয়ার ভয় করা, একইরকম অনেক ছবি তোলা, কাছের ছবি তোলার জন্যও জুম ল্যান্স ব্যবহার করা ফটোগ্রাফারদের জন্য অনেক বড় রকমের ভুল।

করে নিতে পারেন ছোটখাটো একটা কোর্সঃ

বই পড়ে, ইন্টারনেট ঘেঁটে, ছবি দেখে, অভিজ্ঞ কোনো আলোকচিত্রীর সঙ্গে থেকে কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে শেখা যায় ফটোগ্রাফি। তবে পেশা হিসেবে ফটোগ্রাফিকে নিতে চাইলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা জরুরি। আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি আলোকচিত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আলোকচিত্রবিষয়ক ডিপ্লোমা বা স্নাতক ডিগ্রি দিচ্ছে। পাঠশালা, বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি,ঢাকা ফটোগ্রাফি ইনস্টিটিউট,ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (ডিইউপিএস) নামক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদী কোর্স অফার করে থাকে। কোর্সের ধরণ ও মেয়াদ ভেদে কোর্স ফির তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।

শেষ কথাঃ

পরিশেষে ইন্ডিয়ান ফটোগ্রাফার রঘুবীর সিং এর একটা কথা বলে শেষ করি। তাঁর মতে ফটোগ্রাফি অনেকটা খনি এলাকায় সোনা খোঁজার মত। বার বার আপনি খুঁজতে থাকবেন এবং কখনো হয়তো ছোট এক টুকরা আপনি পেতে পারেন। তাঁর মানে হল পরিশ্রমের এবং ধৈর্যের এখানে কোন বিকল্প নেই। শুভ কামনা রইল আপনার জন্য।