Cisco এর CEO জন চেম্বার্স যখন বলেছিল “ইন্টারনেটই সব কিছু”, তখন তাঁর কথা শুনে বিদ্রূপের হাঁসি হেসেছিল সবাই। অথচ  আজ দেখা যাচ্ছে ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশী একটা বাজার তৈরি হয়েছে এই ইন্টারনেট কে ঘিরে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ন বাজার দখল করে নিবে ইন্টারনেট। এই ধারণা থেকেই মূলত তৈরি হয়েছে Internet of Things (IOT).

IOT কিঃ

চলুন প্রথমেই  জেনে নেয়া যাক IOT এর পূর্ণরূপ। IOT এর পূর্ণরূপ হল Internet Of Things। দাঁত ভাঙ্গা কঠিন কোন সংজ্ঞায় না গিয়ে সহজ ভাবে বুঝার চেষ্টা করি IOT জিনিসটা আসলে কি। যখন অনেক গুলো ডিভাইস একটা আরেকটার সাথে ইন্টারনেট দ্বারা যুক্ত থাকবে এবং তাদের মধ্যে ডাটা আদান প্রদান করবে  সেই সিস্টেমটাকেই বলা হয়  IOT। স্বাভাবিক ভাবেই আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে সেই ডিভাইস গুলি আসলে কি হতে পারে। সেই ডিভাইসগুলো হতে পারে আপনার বাসার টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, বাথরুমের কল, দরজার লক থেকে শুরু করে একটা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল, স্ট্রিটলাইট সিস্টেম, GPS ইত্যাদি। এক কথায় বলতে গেলে প্রায় সমস্ত ডিভাইসকেই এর আওতায় আনা সম্ভব।

IOT নিয়ে কল্পনা রাজ্যে বিচরণঃ

সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন IOT ইংলিশ মুভিতে দেখা কল্পনা রাজ্যে নাড়া দেওয়া অবাস্তবকেও বাস্তবে রূপ দিবে। কে জানে হয়তোবা ছাড়িয়েও যাবে। ভাবুনতো ভোর পাঁচটায় স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম ঘড়ি আপনাকে জাগিয়ে দিচ্ছে। তারপর আপনি সাওয়ার নিবেন কিন্তু হিটার পানি গরম করতে ৩০ মিনিট সময় নেয় কিন্তু কোনও এক জাদুবলে তা গরম হয়ে যাচ্ছে আপনি ঘুম থেকে উঠার আগেই। সেই জাদু বাথরুমে আপনার  পছন্দমত    গান  শুনিয়ে দিবে এবং গোসল শেষ হবার সাথে সাথেই কফি বানিয়ে রাখবে অটোমেটেড কফি মেকার এর সাহায্যে। সেই অদৃশ্য জাদু শক্তি অফিসে যাওয়ার জন্য গাড়ি গেরাজের মধ্যে  অটোমেটিক ভাবেই রেডি করে রাখবে  যা কিনা গুগুল এর মাধ্যমে চলে থাকে। আপনার  কাছে এরি মধ্যে নটিফিকেশন এসেছে রাস্তায় আজ প্রচুর জ্যাম ২০ মিনিটি আগে বের হতে হবে যদি কিনা অফিস ঠিক মত পৌছাতে চান  এবং বসের ঝাড়ি খেতে না চান ।  এই যে আপনার  দিনটি শুরু হল নানান ধরনের ডিভাইসের সাহায্য নিয়ে ঠিক এটিকেই বলে থাকে Internet of Things(IOT). ভেবে বলুন তো জীবনকে এত সহজ করা বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদকে ম্যাজিক কল্পনা করলে কি অতিরঞ্জিত হবে ?

 

সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ

“Internet of Things” শব্দটি প্রথম আলোর মুখ দেখে পিটার লুইসের হাত ধরে ১৯৮৫ সালে। তবে বিভিন্ন বস্তু বা ডিভাইসের নেটওয়ার্কের ধারণাটি আরো পুরনো। ১৮৪৪ সালে স্যামুয়েল মোর্স যখন টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করে প্রথমবারের মত মোর্স কোড পাবলিক টেলিগ্রাফ ওয়াশিংটন ডিসি থেকে বাল্টিমোরে পাঠাতে সক্ষম হন, বিজ্ঞানীরা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা শুরু করে যেটা আসলে আধুনিক IOT ধারণাকেই তুলে ধরে।

যেভাবে কাজ করবে IOT:

প্রয়োজনীয় কিছু ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস , সফটওয়্যার এবং সেন্সর এর সমন্বয়ে একটি নেটওয়ার্কিং সিস্টেম তৈরির মাধ্যমে এই প্রযুক্তি মুলত কাজ করবে। সেন্সর এর কাজ হল মানুষ কিংবা যেকোনো বস্তুর গতিবিধি মনিটর করে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া এবং সেটা প্রসেস করে একটি ডিভাইস থেকে আরেকটি ডিভাইস এ প্রেরণ করা। এভাবেই চলতে থাকে একটি আইওটি সিস্টেম। তবে আসল কথা হল নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই নতুন স্মার্ট ডিভাইসগুলা ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হতে পারে।

মনে আছে সেই হৃদয় ছোঁয়া মার্কেটিং স্লোগান –“এমন অনেক কিছুই হবে যা কেউ ভাবেনি আগে”। সত্যি যেন তাই। আপনি ভাবতেই পারেন ফ্রিজকে ইন্টারনেটে যুক্ত করে লাভটা কী, ওর কি ফেইসবুক একাউন্ট হবে নাকী? তা হবে না । তবে সুবিধাটা হল এই সমস্ত যন্ত্র পাতি এখন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আপনি বাজার করতে গেছেন কিন্তু আপনি জানেন না আপনাকে কি নিতে হবে কারণ আপনি জানেন না আপনার ঘরে কি রয়েছে। কিন্তু আপনার ফ্রিজটি যদি IOT কানেকটেড থাকে তাহলে বাজার থেকেই আপনার ফ্রিজে কি কি রাখা আছে নির্দিষ্ট অ্যাপসের মাধ্যমে সেই তথ্য পেয়ে যাবেন। আর এই তথ্য আপনাকে সরবরাহ করবে ফ্রিজ নিজেই। ভাবা যায়!!!

চলুন আরও মজার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। মজার এই স্বপ্নসম্ভার গুলি ভালোই লাগছে, তাই না?? ধরুন আপনি খুব ভুলোমনা মানুষ। হঠাৎ কোন জরুরী কাজে বাইরে চলে এসেছেন। তখন মনে পড়লো আপনার রুম লক করতে ভুলে গেছেন। নো টেনশন, অনেক দূরে বসেই নির্দিষ্ট অ্যাপসের মাধ্যমে আপনার রুম লক করতে পারবেন। ভবিষ্যতে এই IOT এর ব্যবহার এত ব্যাপক হবে যে প্রায় সব ডিভাইসগুলোই IOT কানেক্টেড হয়ে যাবে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে আরো প্রায় ১ ট্রিলিয়ন সেন্সর ইন্টারনেট এর সাথে কানেকটেড হবে অর্থাৎ আই ও টি আরো সম্প্রসারিত হবে।

 

IOT কি শুধুই বিলাসিতা ?

আমাদের মধ্যে সকলের পরিচিত স্কুলের ক্লাসরুম নিয়েই চিন্তা করি। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে আমেরিকার স্কুলে প্রতি ৫ মিনিটের মাঝে ১ মিনিট নস্ট হয় পড়ালেখার বাইরের বিভিন্ন কাজে। অহেতুক এসব কাজের মধ্যে আছে শিক্ষকের নাম ডাকা, শিক্ষকের গলার স্বরের তারতম্যের জন্য সবার বুঝতে অসুবিধা হওয়া, কাগজ আদান প্রদানের ঝামেলা ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাপার টা যদি এমন হয় ক্লাসের মধ্যে ছাত্র ছাত্রীরা বেঞ্চ এ বসার সাথে সাথেই তাদের উপস্থিতি চলে যাবে কম্পিউটারে, তবে কেমন হয়! এটি করা যেতে পারে Nymi এর মত হাতে পড়ার উপযোগী ‘স্মার্টব্যান্ড’ এর মাধ্যমে। তার মানে হল অবাঞ্ছিত বেঁচে যাওয়া এই সময় তাঁরা আরো বেশি productive কাজে লাগাতে পারবে। এবার আপনিই বলুন আইওটি কি প্রয়োজন না বিলাসিতা?

 

ডাটা যখন বিনোদনের রসদ যোগায়ঃ

ডাটা কি শুধুই প্রাণহীন কোনো বস্তুর নাম? ডাটা কি কেবল সাময়িক সময়ের জন্য কাজে লাগে? না, ব্যাপারটা মোটেও এই রকম নয়। আমাদের ডাটা গুলো কিন্তু এখন একটি দিনের জন্য নয় এটি সারা জীবনের জন্য রয়ে যাচ্ছে। একটা উদাহরণ কল্পনা করা যাক। মনে করুন আপনি একটি মেরেজ মিডিয়ার ওয়েব সাইটে বিয়ের মেয়ে দেখার জন্য সাইন আপ করলেন।এবং একটি মেয়ে আপনার পছন্দ সই পেয়েও গেলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তা আর হয়ে উঠলো না। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আপনি ১০ বছর পরে দুই বাচ্চার বাবা। তখন ঐ মেরেজ মিডিয়া আপনার তথ্য ফাঁস করল যেখানে এই তথ্যটিও আছে যে আপনি অমুক তারিখে অমুক মেয়েকে বিয়ের জন্য ঠিক করেছেন ছবি সহ বা ভিডিও সহ । একবার ভাবুন তো ভাবির তখন মনের অবস্থা কেমন হবে!!!! স্বপ্নের যেমন মৃত্যু নেই, ডাটারও  কোন মৃত্য নেই।

IOT করতে কি লাগবেঃ

মনে করেন সারাদিন অফিস করে  প্রচণ্ড গরমে ঘেমে আপনি বাড়ি ফিরছেন। বাড়ি ফিরে AC অন করে ঘরের তাপমাত্রা পরিবর্তন হতেও তো সময় লাগবে। কিন্তু এত সময় কোথায়? আপনি চান ঘরে ঢোকার আগেই আপনার স্মার্ট ফোনটি দিয়ে আপনি AC অন করবেন। ২০১৯ সালে এটা এখন এমন কোন বিষয় নয়। তবে এর জন্য আপনার দরকার ইন্টারনেট এবং আপনার AC এর দরকার একটা Unique IP Adress. আপনার মোবাইল AC এর IP Adress সম্পর্কে জানবে এবং AC আপনার মোবাইল এর IP Adress সম্পর্কে জানবে।