ছোট বেলায় পাঠ্য বইয়ে পড়া সেই বাবা-ছেলের গল্পের কথা মনে পরে, যেখানে বাবা তাঁর ছেলেকে যখন একটা লাঠি দেয় ভাঙ্গার জন্য, ছেলে তা ভেঙ্গে ফেলে। যখন দুইটা লাঠি দেয় , তাও ছেলে ভেঙ্গে ফেলে। কিন্তু ছেলেকে যখন দশটা লাঠি দেয়া হয়, ছেলে তা ভাঙ্গতে পারে না। ঐ খানে moral of the story ছিল একতাই বল (Unity is strength).

গল্পটার আবেদন জীবনের পরতে পরতে সত্য। এ দেশটা আমাদের সবার। সুযোগ সুবিধা ভোগ করব সবাই মিলে, সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করব সবাই মিলে। ইদানিং কালের এমনই এক সমস্যার নাম আগুন।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে। আগুন যেন সেই বহুরূপেই ধরা দিচ্ছে। আগুন ছাড়া জীবন চলে না; অথচ সেই আগুন এখন হয়ে গেছে সারা দেশের জন্য এক ভীতিকর শব্দ।আগুনের ধ্বংসাত্মক রুদ্রমূর্তি যেন চলে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যাদের অফিস এবং বসবাস বহুতল ভবনে তাদের সবার মধ্যেই যেন ‘আগুন’ হয়ে গেছে মূর্তমান আতঙ্ক। আগুন নিয়ে কোন জাদুকরী সমাধান নেই। সাধারণ মানুষ, সরকার, নীতিনির্ধারক, স্থাপনা ও সব কর্মস্থলের মালিকপক্ষ সহ সমাজের সকল স্থলের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ পারে আগুনের ভয়াবহতাকে দমিয়ে দিতে।

Prevention is better than cure

আগুনে পুড়ে পাশবিক যন্ত্রণা ভোগ করে চিকিৎসা নেবার চেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হল আগুন যাতে আমাকে না পুড়িয়ে দেয় সেই ব্যবস্থা করা।

Prevention (প্রতিরোধ)

জন্মদিনের কেকে মোমবাতি জ্বালানো জরুরি নয়। তার পরও যদি জ্বালাতে চান, সেখানে অগ্নিকাণ্ডের রিস্ক নেওয়া হবে। সেটা কি ঠিক হবে? এভাবেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম সম্ভাবনা থাকলেও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। অগ্নিকাণ্ড রোধে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনগুলো হচ্ছে-
১. বহুতল ভবন তৈরী করার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস সাধারণত একটি ক্লিয়ারেন্স দেয় সেক্ষেত্রে এখন ক্লিয়ারেন্সই যথেষ্ট নয় এটি পরিদর্শন করে এখানে বহুতল ভবন নির্মাণযোগ্য কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

২. ফায়ার সেফটির বিষয়টি নিয়মিত অনুসন্ধান করা এবং শিল্প কারখানার মত প্রতি বছর এটি নবায়ন করা যায় কিনা, বছর বছর তা দেখা।

৩. বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা।

৪. নিয়মিত ফায়ার ড্রিল করা (অগ্নিনির্বাপণ মহড়া করা), যেটি প্রতি তিনমাসে একবার হতে পারে।

৫. অগ্নিকান্ডের ক্ষেত্রে দেখা যায় ধোঁয়াতেই অধিকাংশ মানুষ শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়। কাজেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই স্মোক কন্ট্রোলের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা অনুসরণ করা।

৬. আগুন লাগলে পানির অভাব দূর করার জন্য রাজধানীর যেখানে যেখানে সম্ভব জলাশয় বা জলাধার তৈরি করা।

৭. রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশানসহ এখন যেসব লেক রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণ করা।

৮. বাংলাদেশে আগুন লাগলে ৩০ তলা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য বর্তমানে তিনটি সুউচ্চ মই (ল্যাডার) রয়েছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

৯. ভবন নির্মাণের সময় স্থপতিরা যেন আমাদের পরিবেশ এবং বাস্তবতার নিরিখে বহুতল ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন। বর্তমানের ম্যাচ বক্সের আদলে দরজা-জানালা ব্লক করে পুরো কাঁচ ঘেরা দিয়ে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন করা হচ্ছে। সেভাবে না করে বারান্দা বা জানালা নির্মাণ করা। যেন কোন বিপদ ঘটলেও শ্বাস নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকে।

১০. ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শতভাগ ফায়ার এক্সিট নিশ্চিত করা।

১১. ইলেকট্রিক সিস্টেম ডোর ফায়ার এক্সিট থাকবে না, সেগুলো ওপেন দরজা এবং ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

১২. দমকল বাহিনীর সেফটি গিয়ারে তারপলিন সিস্টেম এবং নেট সিস্টেম অন্তর্ভক্ত করা। যাতে কোথাও আগুন লাগলে মানুষ তার মাধ্যমে ঝুলে ঝুলে নেমে যেতে পারে।

১৩. হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোতে রুমের বাইরে বারান্দা বা খোলা জায়গা রাখা। ইন্টেরিয়ার ডিজাইনাররা অনেক সময় এগুলো ব্লক করে দেয়, কাজেই সেটা যেন না হয়।

১৪. আগুনের সময় যেন লিফট ব্যবহার না করা হয়, এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ প্রদান।

১৫. প্রতিটি ভবনে কম করে হলেও দুটি এক্সিট পয়েন্ট যেন থাকে।

প্রযুক্তির ব্যবহার

সাহান দের বাড়ি রাজধানীর পশ্চিম রামপুরায়। তাঁর সেমিস্টার ব্রেক চলছে। ।শীতের এক সকালে সে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল , কিন্তু বিধিবাম! মায়ের চিৎকারে তাঁর ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে সে যা দেখল তাঁর জন্য কোন মানসিক প্রস্তুতি তাঁর ছিল নাঃ তাঁদের ফ্ল্যাটে আগুন লেগেছে। ভয়াবহ আগুন। হতভম্ব সাহান বুঝতে পারল না তাঁর কি করা উচিৎ। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে ফায়ার সার্ভিস কে কল করার জন্য মনস্থির করল। হায় কপাল! বিপদ যখন আসে, চারদিক থেকে আসে। মোবাইল হাতে যেই না ফায়ার সার্ভিসের মোবাইল নাম্বার খুঁজবে , তখনই দেখতে পেল তাঁর ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক ডাউন। যাই হোক, ভাড়াটিয়ার মোবাইল থেকে সে ফায়ার সার্ভিসের হেল্পের জন্য সার্চ দিল। কিন্তু তাঁর নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস কোনটা, তেজগাঁও নাকি খিলগাঁও? দুই জায়গাতেই ফোন দিয়ে সে বুঝতে পারল খিলগাঁও হয়ত তাঁর বাড়ি থেকে নিকটবর্তী। ফোন পিক করা, ঠিকানা বুঝানো এসব করতে করতে চলে গেল অনেক সময়। ঐ দিকে আগুন বেড়েই চলছে। আগুন শুধু এখন আর এক ফ্ল্যাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে গেছে পাশের ফ্ল্যাটে। এরপর ? এরপর আর কি, ঘড়ির কাটা দৌড়াচ্ছে মিনিট থেকে ঘণ্টায় , আগুন দৌড়াচ্ছে এ ফ্ল্যাট থেকে ও ফ্ল্যাটে, এ তলা থেকে ও তলাতে, কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে আছে রামপুরার জ্যামে। গাড়ি যখন সাহানদের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছল, আগুন ততক্ষণে পুরো বিল্ডিং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। সাহানদের পাশের বিল্ডিং ছিল প্লাস্টিকের দানা তৈরির কারখানা, আগুন ঐ কারখানাতেও ছড়িয়ে গেছে। ভয়াবহ ধোঁয়াতে ছড়িয়ে গেছে পুরো এলাকা। অল্প সময়ের মধ্যে যেন পুরো এলাকা নরকে রূপ নিল। সাহানদের বাড়িতে শিশু ও বৃদ্ধ সহ মোট চারজন মারা গেল ।
গল্পের শেষটা এমন হত না যদি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সঠিক সময়ে চলে আসত। সেটা কি করে সম্ভব?

চলুন গল্পটা একটু অন্য মুডে চিন্তা করি। আগুন লাগার সাথে সাথে সাহানদের বাড়িতে লাগানো Smart Fire Detector মুহূর্তের মধ্যে আগুন লাগার তথ্যটি ফায়ার বিগ্রেডের Central Database এ পাঠিয়ে দিল । ডিভাইসের মধ্যে লাগানো GPS প্রযুক্তি ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরকে আগুন লাগার স্থানের ডাটা পাঠিয়ে দিল। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর তখন লোকেশান দেখে সিদ্ধান্ত নিল তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস অফিস হচ্ছে সবচেয়ে সামনে এবং রাস্তা ঘাটের জ্যাম দেখে বুঝা যাচ্ছে ঐ লোকেশান থেকে সহজে গাড়ি সাহান দের বাড়িতে পৌঁছাতে পারবে। প্রধান সদর দপ্তরের মুহূর্তের নির্দেশে ৫ টি ইউনিট মুহূর্তের মধ্যে তেজগাঁ হতে বের হয়ে গেল। ভাবছেন প্রধান সদর দপ্তরের দায়িত্ব শেষ? মোটেও না। প্রধান সদর দপ্তর তখন কথা বলল Centralized Traffic Control (CTC) দপ্তরে। CTC Department তখন তেজগাঁ থেকে রামপুরা যাওয়ার জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলিকে আধুনিক ট্রাফিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রয়োজনীয় সহায়তা করল। ঐ দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর কিন্তু বসে নেই। তাঁরা সব গাড়ির অবস্থান, তদারকি, গাড়ি বহরের সিকুয়্যান্স ঠিক রাখা – এ সব কিছুই তাঁদের অফিসে বসেই করল। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে GPS প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়ি গুলি সহজেই সাহান দের বাড়ি খুঁজে পেল, কোনও খোজা খুঁজি ছাড়াই।

Cure(পুড়ে যাবার পর যা করনীয়)

১। সর্বপ্রথম রোগীকে পোড়ার উৎস বা আগুন থেকে দূরে সরাতে হবে।
২। পোড়া স্থানের আঁটসাট কাপড়, আংটি ইত্যাদি থাকলে সেটি খুলে ফেলতে হবে।
৩।স্বল্পমাত্রার পোড়ার ক্ষেত্রে পোড়ার অংশটিকে ঠাণ্ডা পানিতে কিছুক্ষণের জন্য ডুবিয়ে রাখতে হবে৷
৪। শরীরের যে সকল অংশ পানিতে ডুবানো সম্ভবপর নয় সে সব অংশের জন্য বরফ শীতল পট্টি বা বরফ জড়ানো কাপড় দিয়ে আবৃত করে ফেলতে হবে কিছুক্ষনের জন্য।
৫। স্বল্প মাত্রার পোড়া হলে ক্ষত স্থানে হালকা করে মলম লাগানো যেতে পারে। আর ক্ষত বড় হলে পানি থেকে ওঠানোর পর মলম লাগিয়ে পরিষ্কার প্যাড বা কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ করতে হবে যেন পোড়া অংশটি বায়ুর সংস্পর্শে আসতে না পারে। মলম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৬। ফোসকা থাকলে সাবধানে ব্যান্ডেজ করা উচিত যেন ফোসকাগুলি গলে না যায়।
৭।পোড়া রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়ানো ভালো।
৮। হালকা পোড়া, মাথা ও মুখে পোড়ার ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান খোলা রাখতে হবে।

১. চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো মলম বা ক্রিম লাগাবেন না
২. ফোসকা হলে তা ফুটো করবেন না।
৩. পোড়া স্থানে বরফ, তুলা, ডিম, পেস্ট ইত্যাদি লাগাবেন না
৪. পোড়া জায়গায় যেন আঘাত বা ঘষা না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। পোড়া অংশ কোনক্রমেই ডলাডলি করা যাবে না
৫. আগুন লেগে গেলে ছোটাছুটি করবেন না।

শেষ কথা

হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখবেন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছেঃ এটা কল্পকাহিনীতে কিংবা সিনেমাতে হয়। বাস্তবের বড় সমস্যাকে সমাধান করতে হয় দশে মিলে-কিছু আপনি, কিছু আমি। আমি আপনি মিলেই তো দেশ। কিছু মানুষ আছে কেবল সিস্টেমকে দোষারোপ করবে, কিছু মানুষ আছে সিস্টেম পরিবর্তনের চেষ্টা করে। চলুন আমি-আপনি মিলে একটু সতর্ক হই। আগুনের দানবীয় রুপকে রুখে দেই।