ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। খুব প্রচলিত একটি কথা, কিন্তু মর্মার্থ অনেক বিশাল। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উপরের কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যেকে চায় তার অতি কষ্টের টাকা যেন সঠিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়। কিন্তু বিনিয়োগের সঠিক ক্ষেত্র ঠিক করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। সঠিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আপনি যে প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করবেন তা সম্বন্ধে সঠিক ধারনা এবং নির্ভুল তথ্য, উপাত্তের। এবং সেই সকল তথ্য উপাত্ত সঠিক ভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে যদি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবেই আপনার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সঠিক হবে।

বিনিয়োগের পূর্বে যে সকল বিষয় মাথায় রাখতে হবেঃ

  • শুধু সেরাটা নয়, সেরা এবং উপোযোগিটা বেছে নিতে হবে
  • সময় উপোযোগি সিদ্ধান্ত নিতে হবে
  • তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে
  • বিনিয়োগ এবং লাভের অনুপাত বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে
  • অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে
  • ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে
  • আবেগকে দূরে রেখে বাস্তব তথ্যের উপর ভিক্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে

আপনি মনে মনে ভাবছেন যে বিনিয়োগের এই সকল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমি জানি। কিন্তু বিনিয়োগটা আমি করবো কোথায়? বাংলাদেশে ভালো বিনিয়োগের স্কোপ আছে নাকি?

হ্যাঁ, এই প্রশ্ন অনেক বিনিয়োগকারীর। বিনিয়োগের সঠিক এবং লাভজনক উৎস খুঁজে বের করা একটা কঠিন কাজ।

তাই আমি আজ আপনাকে ধারণা দেব  বিনিয়োগের একটি লাভজনক খাত নিয়ে। আর এই খাতটি হলো স্মার্ট কার পার্কিং সিস্টেম

স্মার্ট কার পার্কিং সম্বন্ধে জানতে উপরের বাটনে ক্লিক করুন।

একটি স্মার্ট কার পার্কিং সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে সকল খরচ বাদে প্রতি মাসে আপনার নীট প্রফিট হতে পারে (প্রায়) ১,৫০,০০০ টাকা। কি বিশ্বাস হচ্ছে না! আসুন আমরা বিষয়টি তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখি।    

সময় উপযোগী বিনিয়োগের খাতঃ

প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দ্রুত গতিতে। আর প্রয়োজনের সাথে প্রযুক্তিকে মানিয়ে নেওয়াটাই স্মার্টনেস। আপনি যদি প্রযুক্তি বাদ দিয়ে এগিয়ে যেতে চান তাহলে এটা নিশ্চিত যে আপনি পিছিয়ে পড়বেন।

ধরুন, আপনি একটি অফিস বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের একজন। প্রতিষ্ঠানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আপনাকে চিন্তা-ভাবনা ও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রতিষ্ঠানের খরচ কমান থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ কাষ্টমার সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বটুকুও নিতে হয় নিজের ঘাড়ে।

আপনার অফিসের পার্কিং স্পেসে প্রচুর সংখ্যক গাড়ি আসা যাওয়া করে। এর মধ্যে যেমন গেস্ট গাড়ি থাকে তেমন অফিসের স্টাফদের গাড়ি তো থাকেই । যা নিয়ন্ত্রণ করতে অনেকটা বেগ পোহাতে হয়, নানা ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনারও সম্মুখীনও হতে হয়। বর্তমানে এইটা  নিয়ন্ত্রনের জন্য আপনি ৫-৬ জন লোক নিয়েছেন, যারা ম্যানুয়ালি আপনার পার্কিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করছে।

এর ফলে আপনার কি কি সমস্যা হচ্ছেঃ

  • আপনার অর্থের অপচয় হচ্ছে
  • আপনি প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছেন
  • অধিক অর্থ খরচ করেও আপনি সেরা সার্ভিসটি পাচ্ছেন না
  • আপনার প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে
  • পার্কিং এ রাখা গাড়ির নিরাপত্তা নেই

কিন্তু স্মার্ট কার পার্কিং সিস্টেম এর মাধ্যমে এর সকল অসুবিধা আপনি দূর করতে পারবেন । এখন সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।

 কাষ্টমার ডিমান্ডঃ

প্রোডাক্ট বা সার্ভিস যাই বলি না কেন সকল ক্ষেত্রেই বাজার চাহিদা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিনিয়োগের পূর্বেই আপনাকে প্রথম দেখতে হবে আপনি যে প্রজেক্টে বিনিয়োগ করছেন তার বাজার চাহিদা কেমন থাকবে এবং বর্তমানে কেমন আছে।

২০১৭ সালের একটা জরিপ অনুযায়ী প্রতিদিন রাস্তায় গড়ে ৩০০ টির ও বেশি গাড়ি নামছে, কিন্তু সে অনুযায়ী পার্কিং স্পেস তৈরি হচ্ছে না। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন মতিঝিল, কাওরান বাজার, তেজগাঁও এর রাস্তার পাশে একটু তাকালে বুঝতে পারবেন কি পরিমাণ গাড়ি রাস্তার পাশে অবৈধ ভাবে পার্ক করা হয়।

রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করা আইনত দন্ডনীয়, তার পরেও লোকজন রাস্তার পাশে গাড়ি রাখছে, কারণ আমাদের দেশে যথাযথ পার্কিং স্পেস নেই। কিন্তু যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা থাকলে বর্তমান চিত্রটি হয়তো পাল্টে যেত।

আপনি বসুন্ধরা শপিং মলের পার্কিং স্পেসের কথা চিন্তা করতে পারেন, সেখানে গাড়ি পার্কিং এর জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা করতে হয়।

সব মিলিয়ে আপনি এটা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেন ঢাকা শহরে স্মার্ট কার পার্কিং এর যথেষ্ট ভালো চাহিদা রয়েছে।

মুনাফার নিশ্চয়তা:

বিনিয়োগের জন্য মুনাফার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপুর্ণ। কারণ যে কোন বিনিয়োগকারী সব দিক চিন্তা করে মুনাফার বিষয়টাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

ধরুন, আপনি ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ততম এলাকা কাওরান বাজারে ১৫০০০ স্কয়ার ফিটের একটি জায়গা নিয়ে পার্কিং স্পেস তৈরি করবেন। যার জন্য প্রতি  মাসে আপনাকে জায়গার ভাড়া বাবদ খরচ করতে হবে ১,৫০,০০০ টাকা। পার্কিং এর রক্ষনাবেক্ষন খরচ প্রতিমাসে ৩০,০০০ টাকা। এবং পার্কিং স্পেস প্রতিস্থাপনের এককালীন খরচ ৩,০০,০০০ টাকা। তাহলে পার্কিং স্পেসের জন্য আপনাকে প্রতি মাসে কত খরচ করতে হবে?

আর গল্প নয়, খাতা কলম হাতে নিন। আমার সাথে অংক করা শুরু করুনঃ

খরচের হিসাবঃ

আয়ের হিসাব

পার্কিং স্পেসে সাধারনত মটরসাইকেল, মাইক্রো, পিকাপ ভ্যানই পার্কিং করা হয়। আমরা এখানে মাইক্রো গাড়ির জন্য হিসাব করব। প্রতিটা মাইক্রো গাড়ি রাখার জন্য জায়গার প্রয়োজন ৩৫০ বর্গ ফুট। গাড়ি পার্কিং করার জন্য গাড়ির মালিককে প্রথম ৩ ঘন্টার জন্য দিতে হয় ৫০ টাকা এবং পরবর্তি প্রতি ঘন্টার জন্য দিতে হয় ১০ টাকা(বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পার্কিং স্পেসের ভাড়া অনুযায়ী)।  আমরা গড়ে প্রতি ঘন্টার বিল ২০ টাকা (পরিবর্তনশীল) ধরে হিসাব করবো। কারণ বেশির ভাগ গাড়ি পার্কিং স্পেসে ৩ ঘন্টার কম সময় রাখা হয়। 

বিষয়টি  চিত্রের মাধ্যমে দেখিঃ

চিত্রে ভুমি অক্ষে গাড়ির পরিমাণ এবং লম্ব অক্ষে আয়ের পরিমাণ হিসেব করা হয়েছে। আপনার পার্কিং এ যদি গড়ে ৪৩ টি গাড়ি থাকে তাহলে মাসে আপনার আয় হবে ১২৯,০০০ টাকা, গাড়ির পরিমাণ কমে যথাক্রমে যদি ৪০,৩৫,৩০, হয় তাহলে আপনার আয় যথাক্রমে (১০,৮০০০), (৭২,০০০), (৩৬,০০০) টাকা হবে।

Pay Back period (মূলধন উঠে আসার সময়কাল)

বিনিয়োগের পূর্বে (PBP) নিয়ে একটা ক্যাল্কুলেশন আপনাকে করতেই হবে। বিনিয়োগ করার পূর্বে আপনার মাথায় আসা উচিৎ, আমি যে বিনিয়োগ করছি তার স্থির খরচ কত বছরে উঠে আসবে? এখানে আমরা স্থির খরচ বলতে প্রতিস্থাপন খরচ (৩,০০,০০০) টাকাকে ধরবো।  

আমরা দেখেছি প্রতি মাসে নীট ইনকাম ১,২৯,৬০০ টাকা। প্রতি মাসে নীট ইনকাম ১,২৯,৬০০ টাকা হলে স্থির খরচ উঠে আসতে সময় লাগবে (৩,০০,০০০/১,২৯,৬০০) = ২.৩১ মাস (প্রায়)।

বিষয়টি  চিত্রের মাধ্যমে দেখিঃ

 আপনার কার পার্কিং স্থাপন করতে স্থির খরচ ধরা হয়েছে ৩,০০,০০০ লক্ষ টাকা। উপরের চিত্রে ভূমি অক্ষে আয় এবং লম্ব অক্ষে বছর ধরা হয়েছে। আপনার মাসে আয় যদি ১,২৯,৬০০ টাকা হয় তাহলে আপনার স্থির খরচ ২.৩ মাসে উঠে আসবে। এভাবে যথাক্রমে আপনার আয় যদি (১,০৮,০০০), (৭২,০০০), ( ৩৬,০০০) হয় তাহলে আপনার স্থির খরচ উঠে আসবে (২.৮, ৪.২ ,৮.৩) মাসে।  

যানজট নিরসনে কাজ করবেঃ

যানজট ঢাকা শহরে মহামারী আঁকার ধারণ করেছে। কিন্তু স্মার্ট পার্কিং এর মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটা সমাধান করা সম্ভব। ঢাকা শহরে পার্কিং ব্যবস্থার খুব বাজে অবস্থা। আপনি চাইলেই উন্নত দেশের মত পার্কিং প্লেস পাবেন না। কিন্তু যদি ঢাকা শহরের পার্কিং ব্যবস্থাকে জন সাধারনের জন্য এভেলেএবল করতে পারা যায় তাহলে রাস্তার যানজট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিল্ডিং/মার্কেটের  এর ভেল্যু বৃদ্ধি করবেঃ

আপনি যদি একজন বিল্ডিং বা মার্কেটের এর মালিক হোন তাহলে আপনার জন্য বিনিয়োগটা অল ইন ওয়ান এর মত কাজ করবে। প্রতিটা মানুষ এখন প্রযুক্তি, মুনাফা, নিরাপত্তা সব দিক থেকে এগিয়ে যেতে চায়। আপনি তার সবটাই পাচ্ছেন স্মার্ট কার পার্কিং এর মাধ্যমে। গাড়ির নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ঝামেলা বিহীন পার্কিং যা আপনার বিল্ডিং/মার্কেটের মূল্য অনেকটাই বাড়িয়ে দিবে।  

দেশের জন্য কাজ করার সুযোগঃ

কেউ যদি সমস্যার সমাধান  নিয়ে কাজ করে তাহলে সফলতা পাওয়া খুব একটা কঠিন হয় না। আমাদের দেশে যানজট ভায়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহর এর অবস্থা নিশ্চই আপনার জানা। এই যানজটের অন্যতম প্রধান একটি কারণ রাস্তার পাশে পার্কিং এর মাধ্যমে রাস্তা সংকোচন করা। এই সমস্যা যদি সমাধান হয় যানজট অনেকটা কমে আসবে বলে আমরা মনে করি। সেই দৃষ্টিকোন থেকে আপনি দেশের জন্য কাজ করছেন এটা বললে নিশ্চই ভুল হবে না।

কিছু ভালো চিন্তা এবং সঠিক তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষনের মাধ্যমে গৃহিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপনি যেমন পৌঁছে যাবেন আপনার লক্ষ্যে, তেমনি এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ।