সুষ্ঠ নগর পরিকল্পনা, সুন্দর শহর। পরিকল্পিত নগরায়ন অর্থ হলো যেখানে সকল ধরনের সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে পরিবেশগত সকল উপাদানের পুর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নগরের একটি উপাদানের সাথে আরেকটি উপাদান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোন একটির সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে এর প্রভাব পরে গোটা নগরজীবনে। তেমনি ভাবে আমরা মনে করি সঠিক পার্কিং ব্যবস্থার অভাব প্রভাবিত করছে সম্পূর্ণ নগর জীবনকে। আমাদের আজকের  আলোচনার বিষয় হলো একটি সঠিক নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সঠিক পার্কিং ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 

নগর সুবিধার মধ্যে পরিবহন সুবিধা অন্যতম একটি নাগরিক চাহিদা। যানজটমুক্ত পরিবহন ব্যবস্থা সকলেরই কাম্য এবং সে লক্ষ্যেই দেশের নগর পরিকল্পনা হওয়া উচিৎ। কিন্তু যানজট মুক্ত যানবাহন ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এবং তার কারণ হিসেবে আমরা সঠিক পার্কিং ব্যবস্থার অভাবকে মোটেই খাটো দেখতে পারি না।

সুষ্ঠ পার্কিং ব্যবস্থার অভাব নগর পরিকল্পনাকে যেভাবে বাধাগ্রস্থ করছেঃ  

যান চলাচল বাধাগ্রস্থ হচ্ছেঃ

সুষ্ঠ পরিবহন ব্যবস্থাকে অনেকটাই বাধাগ্রস্থ করছে সঠিক পার্কিং ব্যবস্থা। ঢাকা শহরে সঠিক যুগোপযোগী পার্কিং ব্যবস্থার অনেক কমতি আছে। প্রয়োজনমত পার্কিং এর স্থান না পাওয়ার কারণে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করে রাস্তার অনেকাংশ যান চলাচলের অনুপযোগী করা হচ্ছে। যার দীর্ঘমেয়াদি একটা প্রভাব পড়ছে শহরের পুরো পরিবহন ব্যবস্থার উপর। অবৈধ পার্কিং এর মাধ্যমে রাস্তা দখলের চিত্র একটি ছবি দেখলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। রাস্তার উপর এই পার্কিং ব্যবস্থা একটি নগর পরিকল্পনাকে প্রথম ধাপেই শেষ করে দিচ্ছে। 

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে মোট ১৯ ধরণের মোটরযানের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০১৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১১ লাখ ৬০ হাজার মোটরযানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়াও অনেক অনিবন্ধিত গাড়ি ঢাকা শহরে চলছে। এই সকল মটর যানের সাথে আছে রিকসা, সাইকেল সহ অন্যান্য ছোট যানবাহন। বিরামহীন ছুটে চলা এই সকল গাড়ির সঠিক পার্কিং স্থান কতটা আছে? নেই বললেই চলে! আমরা এখানে প্রশ্ন করতেই পারি আধুনিক নগর পরিকল্পনায় স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা কি অনুপস্থিত? 

বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়াচ্ছেঃ

এই বিশ্ব খুব দ্রুত নগরায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি নগরায়নের দিকে। ইউনাইটেড ন্যাশন এর ধারনা মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৮ শতাংশ মানুষ বসবাস শুরু করবে শহরে। তখন শহর গুলোর জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়বে সকল কিছু নিয়ন্ত্রণে রাখা। তখন শহরগুলো থেকে ৭০ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। এর অধিকাংশ কার্বন আসবে গাড়ি থেকে নিঃসৃত কালো ধুঁয়া থেকে। যার প্রধান কারণ রাস্তায় যানজটে গাড়ি আটকে থাকা। এবং এই অবস্থার জন্য পার্কিং এর অপ্রতুলতা অনেকটাই দায়ী। এ অবস্থা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আধুনিক নগর ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্থ করবে। 

আর্থিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করছেঃ

যানজটে আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয়, যাকে প্রত্যক্ষ ভাবে মদদ দিচ্ছে সঠিক পার্কিং ব্যবস্থার অভাব। প্রথম আলোর এক জরীপ অনুযায়ী যানজটে বছরে ক্ষতি ৩৭ হাজার কোটি টাকা। দিন দিন যানজট পরিস্থিতি তীব্র হচ্ছে বিশেষ করে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতান ইত্যাদি জায়গায় যাতায়াত করা দুঃস্বপ্নের মতো। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করছে।  

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিঃ

কোথায় যাবে যানা আছে কিন্তু কখন যাবে তা জানা নেই। ভয়াবহ যানজটে নগরবাসী যখন কর্মঘণ্টার অপচয়ের হিসেব মিটাতে ব্যস্ত তখন ঘটছে নিজের অজান্তেই স্বাস্থ্যহানির ঘটনা। দীর্ঘ সময় রাস্তায় কেটে যাওয়া ক্লান্তি আর অবসাদে নষ্ট হচ্ছে মানুষের চিন্তা চেতনা। সমাধান না থাকাই অসহায়ত্ব তাদের কণ্ঠে।

পার্কিং বিষয়ক কি ধরনের নীতিমালা রয়েছেঃ

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মান বিধিমালাতে পার্কিং নির্মানের নীতিমালা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। পার্কিং ব্যবস্থার গুরুত্ব থাকলেও এ নিয়ে আগ্রহ খুব কম। সংক্ষেপে ইমারত নির্মানের নীতিমালাটা তুলে ধরা হলোঃ 

                                 মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮

 

কিন্তু এই ইমারত নির্মান আইন অমান্য করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কারো কাছে এটা শুধু কাগজে কলমে লিখা নিছক আইন মাত্র। যার ফলে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্থ হচ্ছে নগর পরিকল্পনার উন্নয়নব্যবস্থা।

সুশৃঙ্খল পার্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কতটুকু পরিবর্তন আসবে?

সঠিক স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা বর্তমান অবস্থা থেকে অনেকটাই বের করে নিয়ে আসতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দেন। ইমারত আইন মেনে পার্কিং ব্যবস্থা রেখে যদি ভবন নির্মান করা হয় তাহলে বর্তমান রাস্তার চিত্র পাল্টে যাবে। তবে ম্যানুয়াল পার্কিং ব্যবস্থা থেকে যদি আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থার মধ্যে দেশের সকল পার্কিং স্পেস গুলো নিয়ে আসা যায় তবে ফলাফল আরো দ্রুত পাওয়া যাবে। 

রাস্তার দুই পাশের অবৈধ পার্কিং, অফিস, মার্কেটের সামনে পার্ক করে রাখা গাড়ি যদি পার্কিং স্পেসে রাখা হয় তাহলে রাস্তার যানজটের চিত্র অনেকটা পাল্টে যাবে। 

যে যে উপায়ে পার্কিং ব্যবস্থা করা যায়

ইনডোর পার্কিং ব্যবস্থাঃ 

প্রতিটা মার্কেট, অফিস, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতান যেখানে পার্কিং প্রয়োজন সেখানে পর্যাপ্ত পার্কিং এর ব্যবস্থা করলে রাস্তার পাশে পার্কিং এর লাইন চোখে পরবে না। যা অবশ্যই যানজট কমাবে এবং সৌন্দর্য বর্ধনেও ভূমিকা রাখবে। সার্বিকভাবে নগর পরিকল্পনা বাস্তাবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে স্মার্ট কার পার্কিং ব্যবস্থা। 

অনস্ট্রিট পার্কিংঃ 

নগরবাসীর গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধার্থে অস্থায়ীভাবে অনস্ট্রিট গাড়ি পার্কিং সার্ভিস চালু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু এতে প্রযুক্তির কোন ব্যবহার নেই। রাস্তার পাশেই নির্দিষ্ট কোন স্থানে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে যদি পার্কিং ব্যবস্থা করা হয় তাহলে যানজটের এই সমস্যা দূর করা সম্ভব। 

আউটডোর পার্কিং প্লেসঃ

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা আছে কিন্তু সেগুলো একটিও আধুনিক মানের নয়। যেমন পল্লবি বাস স্ট্যন্ড, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল, গুলিস্থান বাস টার্মিনাল এছারাও ঢাকা শহরের অনেক স্থানেই পার্কিং এর ব্যবস্থা আছে। এই পার্কিং এর স্থান গুলোকে আধুনিক পার্কিং এর স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ঐ স্থান গুলোতে আরো বেশি সংখ্যক গাড়ি পার্কিং করা যাবে এবং সাধারন জনগণ গাড়ি পার্কিং এর ক্ষেত্রে আরো বেশি আগ্রহী হবে।

একটি বাস্তবায়নযোগ্য সুন্দর নগর পরিকল্পনার মধ্যে অবশ্যই স্থান পাওয়া দরকার সুষ্ট যানবাহন ব্যবস্থা। সুষ্ঠ, সুন্দর যানবাহন ব্যবস্থার সাথে পার্কিং ব্যবস্থা একটি সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করে। দেশের পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাই ল্যবস বাংলাদেশ লিঃ কাজ করে যাচ্ছে। স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সকল ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে পাই ল্যাবস। একটি যানজটমুক্ত গতিশীল শহর যেমন দেশের প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা তেমন আমরাও দেশের একজন হয়ে একই আশা ব্যক্ত করছি।